প্রিন্ট এর তারিখ : ০৫ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৪ আগস্ট ২০২৬
রাজবাড়ীতে গ্রাহকের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে পোষ্টমাষ্টারসহ সাত জনের বিরুদ্ধে ডাক বিভাগের মামলা
||
নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজবাড়ীঃ রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে সঞ্চয় হিসাব খোলার নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রায় ৯২ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনায় তৎকালীন অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত পোষ্টমাষ্টারসহ সাতজনের বিরুদ্ধে দুর্ণীতি প্রতিরোধ আইনে মামলা দায়ের হয়েছে। প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে সাদা কাগজে দাপ্তরিক সিল ব্যবহার করে ৬১ জন গ্রাহকের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে রোববার (২ আগষ্ট) রাজবাড়ীর সিনিয়র বিশেষ জজ আদালতে কুষ্টিয়া ডাকবিভাগের পোস্ট অফিসের পরিদর্শক (প্রশাসন) মো. শহিদুল ইসলাম মামলাটি করেন। মামলায় অভিযুক্তরা হলেন, রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের সহকারী পোষ্টমাষ্টার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত পোষ্টমাষ্টার বিকাশ চন্দ্র, প্রধান ডাকঘরের লেটার রাইটার সদর উপজেলার বাঘিয়া গ্রামের আয়ুব আলী মৃধার ছেলে শিহাব মৃধা, শিহাব মৃধার আপন ভাই ডাকঘরের পিএলআই এজেন্ট (ইন্সুরেন্স গ্রাহক সংগ্রহকারী) মাহবুব হাসান মৃধা, আপন মামা প্রধান ডাকঘরের অফিস সহায়ক রেজাউল আলম, প্রধান ডাকঘরের তৎকালীন ট্রেজারার ট্রেজারার নাজমুল হাসান, প্রধান ডাকঘরের পোস্টাল অপারেটর মো. গোলাম মোস্তফা বাচ্চু ও পোস্টাল অপারেটর প্রণব কুমার সরকার। রাজবাড়ী বার ও মামলার আইনজীবি অ্যাডভোকেট বিজন কুমার ঘোষ জানান, মামলাটি বিচারক গ্রহণ করেছেন। আদেশ পরবর্তীতে প্রদান করবেন।দূর্ণীতির বিষয়টি প্রকাশের পর তৎকালীন সহকারী পোষ্টমাষ্টার ও অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত পোষ্টমাষ্টার বিকাশ চন্দ্রকে কুষ্টিয়া বিভাগীয় কার্যালয়ে বদলি করা হয়। এছাড়া ১৩ জুলাই থেকে লেটার রাইটার শিহাব মৃধা পলাতক রয়েছেন, তাঁর ভাই মাহবুব হাসান মৃধাও প্রধান ডাকঘরে অনুপস্থিত রয়েছেন। তৎকালীন ট্রেজারার নাজমুল হাসানকে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার খাসমোথয়াপুর শাখায় বদলি করা হয়। অভিযোগে বলা হয়, অভিযুক্তরা পরষ্পর যোগসাজসে দুর্ণীতির আশ্রয় নিয়ে সঞ্চয় হিসাব খোলার নামে সাদা কাগজে দাপ্তরিক সিল ব্যবহার করে ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর থেকে চলতি বছর ৩০ জুন পর্যন্ত ৭৪ জন গ্রাহকের ১ কোটি ১২ লাখ ৩০ হাজার টাকা গ্রহণ করেন। রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের পোষ্টমাষ্টার বিকাশ চন্দ্রসহ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহায়তায় এটি করেন লেটার রাইটার শিহাব মৃধা। ওই অর্থ সঞ্চয় ব্যাংকে ট্রেজারীতে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ এবং অসৎ উদ্দেশ্যে নিজ হেফাজতে রাখেন। পরবর্তীতে লেটার রাইটার শিহাব মৃধা ১৩ জন গ্রাহকের ২০ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ফেরত দিলেও ৬১ জনের ৯১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা ফেরত দেননি। অভিযুক্ত শিহাব মৃধার পরিবার ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার অঙ্গিকার করেও পরে অস্বীকার করেন। ডাক বিভাগের তথ্যমতে, ‘লেটার রাইটার’ স্থায়ী বা রাজস্বভুক্ত কোনো পদ নয়। কিছু ডাকঘরে কাজের সুবিধার জন্য অস্থায়ী ভিত্তিতে এ ধরনের লেটার রাইটার হিসেবে কোনো ব্যক্তিকে নিয়োগ করা হয়। অভিযুক্ত শিহাব মৃধা রাজবাড়ী সদর উপজেলার মূলঘর ইউনিয়নের রশোড়া বাঘিয়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। এর আগে গত ৩০ জুলাই ভুক্তভোগী গ্রাহকদের পক্ষে সদর উপজেলার চর ল²ীপুর গ্রামের সেলিম মিয়ার স্ত্রী নাছরিন আক্তার বাদী হয়ে রাজবাড়ীর অতিরিক্ত চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট ও সদর আমলী আদালতে পোষ্টামাষ্টর বিকাশ চন্দ্রসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে তিনি দÐবিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় আদালতে মামলা করেন। আদালতের বিচারক হায়দার আলী মামলাটি আমলে নিয়ে সমন জারির নির্দেশ দেন এবং ৩ নভেম্বর তাঁদের আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন। জানা গেছে, ১৩ জুলাই কুষ্টিয়া বিভাগীয় ডাক কার্যালয়ের কর্মকর্তারা অভিযোগের প্রাথমিক খবর পেয়ে রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে যান। সে সময় লেটার রাইটার শিহাবকে ডাকঘরে পাওয়া গেলেও তাঁকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। পরে শিহাব মৃধা কৌশলে সেখান থেকে পালিয়ে যান। এরপর থেকে তাঁর খোঁজ পাওয়া যায়নি। ভুক্তভোগীরা অর্থ ফেরতের দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ, মানববন্ধনের পাশাপাশি জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে স্মারকলিপি দেন। অভিযোগ তদন্তে ১৬ জুলাই খুলনা দক্ষিণাঞ্চলের পোস্টমাস্টার জেনারেল (চলতি দায়িত্ব) কবির আহমেদ স্বাক্ষরিত এক পত্রে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটিতে খুলনা দক্ষিণাঞ্চলের অতিরিক্ত পোস্টমাস্টার জেনারলকে সভাপতি, খুলনা সার্কেল অফিসের সুপারিনটেনডেন্টকে সদস্য সচিব, ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল (তদন্ত) দক্ষিণাঞ্চল খুলনা ও কুষ্টিয়া বিভাগের ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেলকে সদস্য করা হয়েছে। কুষ্টিয়া বিভাগীয় কার্যালয় থেকেও চার সদস্যের পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত পোষ্টমাষ্টার শামীম আহমেদ বলেন, ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে গ্রাহকদের টাকা ফেরতের অঙ্গিকার করলেও অভিযুক্তরা পরে অস্বীকার করায় রোববার কুষ্টিয়া বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিদর্শক(প্রশাসন) মো. শহিদুল ইসলাম তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। শিহাব মৃধা ২০২১ সাল থেকে ‘হেল্পিং হ্যান্ডস’ হিসেবে লেটার রাইটারের দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি ও তার ভাই মাহবুব হাসান মৃধা রাজস্বভুক্ত কর্মচারী নন। রাজবাড়ী যোগদানের পর তিনি ৬ জুলাই এক গ্রাহকের কাছে সাদা কাগজের স্লিপ পাওয়ার পর বিষয়টি প্রকাশ পায়।
সম্পাদক: রাশেদ ইসলাম
কপিরাইট © ২০২৫ । সর্বস্ব সংরক্ষিত রাজবাড়ী মেইল